একনজরে জেনে নিন কেমন ছিল ফিনিশীয় সভ্যতার ইতিহাস

ফিনিশীয় সভ্যতা:-




খ্রিষ্টপূর্ব ১৮০০ অব্দ থেকে লেবানন ও ভূ-মধ্যসাগরের মধ্যবর্তী অঞ্চলে গড়ে ওঠে ফিনিশীয় সভ্যতা। খ্রিস্টপূর্ব ২০০০-৬০০ অব্দের মধ্য এখানে আর্যরা  উন্নত সভ্যতা গড়ে তােলে। 

                   মানচিত্রে ফিনিশীয় সভ্যতার অবস্থান



ইতিহাসের অধিকাংশ সময় ফিনিশীয় রাজনীতি ছিলো অনেকটা কনফেডারেশন প্রকৃতির। সিডানে Tetramnestos, টায়ারে Mattan এবং আরাদোসে Marbalos; এই তিনজন শাসক মিলে একটি কনফেডারেশন গঠন করে। সিডনের গুরুত্ব ছিল খ্রিস্টপূর্ব ১০০০ সাল পর্যন্ত। তারপর টায়ারের আধিপত্য ক্রমশ বেড়ে যেতে থাকে। ওল্ড টেস্টামেন্টে টায়ারের রাজা হিরাম ও জেরুজালেমের হিব্রু রাজা দাউদের মধ্যকার মিত্রতার কথা আছে। খ্রিস্টপূর্ব ৯৭০ সাল নাগাদ সলোমন ক্ষমতায় এলে দক্ষিণের শহরগুলো ফিনিশীয়রা ফেরত পায়। 
প্রত্যেকটি শহরের আলাদা প্রতিরক্ষা, সৈন্য ও নৌবহর ছিল। খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতকে তিউনিশিয়া, উতিকা, হাদ্রমেতাম ও অন্যান্য স্বাধীন অঞ্চল মিলিত হয়ে কার্থেজ রাষ্ট্র (নগর রাষ্ট্র) সংগঠিত হয়। 
ফিনিশীয়রা পারসিক ক্ষমতার অধীনস্ত থাকার সময় ধনী ব্যবসায়ীদের নিয়ে জ্যেষ্ঠ কাউন্সিল গঠন করা হয়, যাদের কাজ ছিল অনেকটা রাজার উপদেষ্টা পরিষদের মতো। ক্ষমতা পরিচালিত হতো সর্বোপরি দুজন ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে। আজীবন কালের জন্য নির্বাচিত হতো ৩০০ সদস্যের বিশেষ সিনেট, আর নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নির্বাচিত হতো ১০৪ সদস্যের একটি সাধারণ সভা।
 এ সভ্যতার অধিবাসীরা সামরিক শক্তিতে খ্যাতি লাভ করেছিল। সভ্যতার ইতিহাসে দুইটি ক্ষেত্রে পারসীয়দের অবদান ছিল গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমটি সুষ্ঠ ও সুদক্ষ প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তােলা এবং দ্বিতীয়টি ধর্মীয় ক্ষেত্রে নতুন ধারণা এবং বিশ্বাস নিয়ে আসা। পারস্যের ইতিহাসে কাইরাসদারিয়ুস ছিলেন সবচেয়ে সফল শাসক। ৩০০ খ্রস্টপূর্বাব্দে আলেকজান্ডার সমগ্র পারস্য সাম্রাজ্য দখল করেন। 

                              শাশনরত সালেমান 



 সভ্যতার ইতিহাসে ফিনিশীয়দের পরিচয় ছিল মূলত শ্রেষ্ঠ নাবিকজাহাজ নির্মাতা হিসেবে। লেবানন পর্বত এবং ভূমধ্যসাগরের মাঝামাঝি এক ফালি সরু ভূমিতে ফিনিশীয় রাষ্ট্র গড়ে উঠেছিল। কৃষিকাজ করার মতো উর্বর জমি সেখানে ছিল না। চাষবাস করার উপযুক্ত জমি না থাকার কারণে ফিনিশীয়দের মূল পেশা এবং তাদের আয়ের একমাত্র উৎস ছিল বাণিজ্যধ্রুবতারা দেখে তারা দিক নির্ণয় করতে এবং রাতে জাহাজ চালাতে পারত। এই কারণে ধ্রুবতারা ‘ফিনিশীয় তারা’ (Phonecian Star) নামে পরিচিত।
খ্রিস্টপূর্ব ২৭০০ সালেই মিশরের সাথে তাদের বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ১৫৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ নাগাদ ফিনিশীয় অঞ্চল পরিণত হয় প্রদেশে। ১২০০ খ্রিস্টপূর্বের দিকে সিডন, টায়ার, বিবলোস এবং আরদুসকে কেন্দ্র করে আধিপত্য বিস্তার করতে সক্ষম হয়। বলা বাহুল্য, এদের প্রথম তিনটি বর্তমান লেবানন এবং শেষটি বর্তমান সিরিয়ায় অবস্থিত। যদিও রাজনৈতিক কাঠামোর চেয়ে বাণিজ্যিক প্রতিপত্তি তৈরীতেই তাদের অধিক মনোনিবেশ করতে দেখা যায়। তবে; মিশর, এশিয়া মাইনর, বলকান অঞ্চল এবং পশ্চিম ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে তাদের উল্লেখযোগ্য প্রভাবের প্রমাণ পাওয়া যায়।
 সভ্যতার ইতিহাসে ফিনিশীয়দের সবচেয়ে বড় অবদান হল বর্ণমালার উদ্ভাবন। তারা ২২ টি ব্যঞ্জনবর্ণের (Consonants) উদ্ভাবন করে যা থেকে আধুনিক বর্ণমালার সূচনা হয় এখান থেকেই। ফিনিশীয়দের উদ্ভাবিত বর্ণমালার সাথে পরবর্তীতে গ্রিকরা স্বরবর্ণ (Vowels) যােগ করে বর্ণমালাকে সম্পূর্ণ করে। এছাড়াও ফিনিশীয়রা মাটির পাত্র তৈরী দক্ষতার সাথে কাপড় প্রস্তুত রং করতে পারত।

         প্রস্তরে খোদিত ফিনিশীয়দের তৈরী জাহাজের আদল 



  এই ফিনিশীয় বর্ণমালায় রয়েছে ২২টি অক্ষর, যার সবই ব্যঞ্জনবর্ণ, এবং আবজাদ হিসেবে বর্ণনা করা হয়ে থাকে। ফিনিশীয় ভাষা লুইখতে এটি ব্যবহৃত হতো যা ফিনিশীয় সভ্যতার সময় উত্তরাঞ্চলের একটি সেমিটিক ভাষা ছিল। ফিনিশিয়রা কালি, কলমকাগজের ব্যাবহার খুব ভালোভাবে জানত।
ফিনিশীয় লিপির অপভ্রংশ থেকে (খ্রিঃপূঃ ৮-এর শতকে) আরামায়িক লিপি জন্মলাভ করে। এই আরামায়িক লিপি থেকে ২য়-৪র্থ খ্রিস্টীয় শতকে নাবাতীয় লিপির উদ্ভব হয়, যেটি পরবর্তীকালে আরবি লিপির জন্মদান করে।

                                 ফিনিশীয় লিপি 



ফিনিশীয় ধর্মবিশ্বাসে কানানাইট প্রভাব বিদ্যমান। যদিও অঞ্চল ভেদে বিশ্বাস ও চর্চার মধ্যে যথেষ্ট ফারাক দেখা যেতো। বিবলোস এর প্রধান উপাস্য ছিলো এল, বাআলাত এবং আদোনিস। এল এর ধারণা নিহিত সেমেটিক বিশ্বাসের ভেতর। দেবতা হিসেবে এর প্রধান্য মেনে নেওয়া হলেও দৈনন্দিন জীবনে এর কোন সক্রিয়তা ছিল না। ভূমি  ও উর্বরতার দেবী ছিলেন বাআলাত। অন্যদিকে আদোনিসকে পরিচিত করা যায় অনেকটা ঋতুচক্রের ব্যাক্তিরূপ হিসাবে। সিডনের প্রধান দেবতা বা-আল। চন্দ্র, প্রেম ও প্রাচুর্যের জন্য দেবী আসতারতের উল্লেখ শিলালিপিতে পাওয়া যায়।
 মৃতের সকারের জন্য চিলঘর ব্যবহার করে জোরােস্ট্রিয় বা জরথুস্ত্র ধর্মাবলম্বীরা। খ্রিষ্টপূর্ব ৭ম শতকের দিকে এশমুন নামক এক দেবতার নাম জানতে পারা যায়, যিনি চিকিৎসার সাথে সম্পর্কিত। অন্যান্য দেবতার মধ্যে আগুন ও আলোর দেবতা রেশেফ এবং শষ্যের দেবতা দাগুনের নাম গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া চিকিৎসা ও সর্পদেবতা শদ্রপা, লোহা ও নির্মাণসামগ্রীর দেবতা ছুসর, সততা ও ন্যায়বিচারের দেবতা সিদিক ও মিসোর এবং অন্যান্য বহু দেবতার প্রতি বিশ্বাসজনিত প্রভাব ফিনিশীয়দের জীবনে বহুল বৈচিত্র্য এনেছিল। দেবতার আহার, পানীয় হিসাবে পশু-পাখি বলি প্রথার প্রচলন ছিল। বিভিন্ন দুর্যোগে কিংবা ‍যুদ্ধে মানুষ বিশেষত শিশু বলি দেওয়ায় প্রমাণও পাওয়া যায়। খ্রিষ্টপূর্ব ৪০৯ সালে কার্থেজে মেলকার্তের উদ্দেশ্যে ৩০০০ বন্দিকে বলি দেবার কথা জানা গেছে। 
কবর দেবার প্রথায় ফিনিশীয়দের সাথে মিশরীয়দের যথেষ্ট সাদৃশ্য দেখা যায়। বিবলোসসিডনের কবরগুলো ৬ মিটার বা তার গভীর গর্ত ছিল। তিউনিশিয়ায় সমাধিসৌধ পাওয়া গেলেও ফিনিশীয়রা সমাধিতে সৌধ নির্মাণে অতোটা আগ্রহী ছিল না বলেই মনে করা হয়। কবর দেওয়ার ক্ষেত্রে সর্বত্র কফিনসহ কবরের প্রথা প্রচলিত ছিল।

                        প্রস্তরিকৃত বলি প্রদানের চিত্র 




চিত্রঋণ: ইন্টারনেট 

Comments

  1. ভালো লাগলো

    ReplyDelete
  2. Very informative ❣️

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular posts from this blog

একনজরে জেনে নিন মেসোপটেমিয়া সভ্যতার ইতিহাস

একনজরে জেনে নিন কেমন ছিল সুমেরীয় সভ্যতার ইতিহাস