একনজরে জেনে নিন কেমন ছিল সিন্ধু সভ্যতার ইতিহাস

সিন্ধু সভ্যতা:-




সিন্ধু সভ্যতা ছিল মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত সিন্ধু অববাহিকা। এই সভ্যতা প্রথমদিকে পাঞ্জাবের সিন্ধু অববাহিকায় বিস্তার লাভ করে, পরে তা প্রসারিত হয় ঘগ্গর-হকরা নদী উপত্যকা এবং গঙ্গা-যমুনা দোয়াব অঞ্চল পর্যন্ত। বর্তমান পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রায় সম্পূর্ণ অংশ, ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের পশ্চিমদিকের রাজ্যগুলি, দক্ষিণ-পূর্ব আফগানিস্তান এবং বালুচিস্তান প্রদেশের পূর্ব অংশ এই সভ্যতার অন্তর্গত।
পূর্ণবর্ধিত সময়কালে এই সভ্যতা পরিচিত হরপ্পা সভ্যতা নামে। হরপ্পা ছিল এই সভ্যতার প্রথম আবিষ্কৃত নগরগুলির মধ্যে অন্যতম একটি। ১৯২০-এর দশকে তদানীন্তন ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশে প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্যের ফলে এই শহরটি আবিষ্কৃত হয়। ১৯৯৯ সালেও এই সভ্যতার বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নসামগ্রী উদ্ধার হয়েছে। মহেঞ্জোদাড়ো ছিল সিন্ধু সভ্যতার প্রাণকেন্দ্র।

     
                       মানচিত্রে সিন্ধু সভ্যতার বিস্তৃতি 



সিন্ধু সভ্যতার জনগণের রাজনৈতিক জীবন ও শাসনপ্রণালি সম্পর্কে বিশেষ কিছুই জানা যায় না। মহেঞ্জোদারােহরপ্পার নগরবিন্যাস প্রায় একই রকম ছিল। এগুলাের ধ্বংসাবশেষ দেখে নিশ্চিতভাবে বােঝা যায় যে, পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী উঁচু ভিত গঠন করে তার ওপর উপর বাড়িগুলি নির্মাণ করা হয়েছিল। শহরগুলাের এক পাশে বেশ উঁচু একটি করে নগরদুর্গ নির্মাণ করা হতাে। চারদিক থাকত প্রাচীর দ্বারা সম্পূর্ণভাবে সুরক্ষিত। নগরের শাসনকর্তারাই নগর দুর্গগুলিতে বসবাস করতেন।
একটি প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত শহুরে সংস্কৃতি সিন্ধু উপত্যকার সভ্যতায় স্পষ্ট ফুটে উঠেছিল, যা তাদেরকে এই অঞ্চলের প্রথম নগরকেন্দ্রিক সভ্যতা স্থাপনের এক নতুন দিকে চালনা করে।
হরপ্পা, মহেঞ্জোদারো এবং সম্প্রতি আংশিকভাবে খনন করা রাখিগড়িতে যেমন দেখা যায়, এই নগর পরিকল্পনাটিতে বিশ্বের প্রথম পরিচিত নগর যেখানে স্যানিটেশন ব্যবস্থা বজায় ছিল। শহরের অভ্যন্তরে, স্বতন্ত্র বাড়িগুলি কূপ থেকে জল তুলে ব্যাবহার করত। স্নানাগার থেকে বর্জ্য জলকে ঢেকে দেওয়া নালা দিয়ে বের করে দেওয়া হতো। এই অঞ্চলের কিছু গ্রামে বসতি নির্মাণ অনেক ক্ষেত্রে হরপ্পাবাসীদের গৃহ নির্মাণের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ।
হরপ্পানদের উন্নত স্থাপত্যকলার প্রমাণ তাদের চিত্তাকর্ষক ডকইয়ার্ড, শস্যভাণ্ডার, গুদাম, ইটের প্ল্যাটফর্ম এবং প্রতিরক্ষামূলক দেয়াল ইত্যাদি থেকে পাওয়া যায়। শহরের বিশাল প্রাচীর প্রবল বন্যা ও বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষা করত।
 সভ্যতার সমসাময়িক, মেসোপটেমিয়া এবং প্রাচীন মিশরের তীক্ষ্ণ বিপরীতে, কোন বড় স্মারক কাঠামো নির্মিত হয়নি। প্রাসাদ বা মন্দিরের কোন চূড়ান্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। কিছু শস্যভাণ্ডারের কাঠামো দেখে মনে করা হয় সেখানে কৃষিব্যাবস্থা বেশ উন্নত ছিল। প্রায় ৭০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ নাগাদ বেলুচিস্তানে সিন্ধু উপত্যকায় সর্বপ্রথম কৃষির উদ্ভব হয়েছিল। কৃষির উদ্ভবের ফলে মানুষ যাযাবর বৃত্তি ছেড়ে স্থায়ীভাবে সেখানে জীবনযাপন শুরু করে, যার ফলে তাদের জনসংখ্যা বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়।

                     সিন্ধু সভ্যতার নগরের ধ্বংসাবশেষ 



 সিন্ধু লিপি বা হরপ্পান লিপি আসলে সিন্ধু সভ্যতা দ্বারা উদ্ভাবিত কিছু চিহ্নের সংকলন। এই চিহ্ন সম্বলিত বেশিরভাগ শিলালিপি আকারে ক্ষুদ্র হওয়ায় এটি সিন্ধু সভ্যতার সময়কার ঠিক কোন লিখন পদ্ধতির জন্য ব্যবহৃত হয়েছিল কিনা তা বলা খুব কঠিন। অনেক প্রচেষ্টার পরেও এই চিহ্নগুলোর অর্থ উদ্ধার করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। জ্ঞাত এমন কোন দ্বিভাষিক শিলালিপি নেই যা এর অর্থোদ্ধারে সাহায্য করতে পারে এবং সময়ের সাথে এই লিপির উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনও হয়নি। তবে স্থানভেদে কিছু কিছু লিপিতে শব্দবিন্যাসের প্রভেদ লক্ষ্য করা যায়। 

সিন্ধু লিপির তিনটি স্ট্যাম্প এবং তাদের ছাপ যা প্রাণীর পাশাপাশি বিশেষভাবে সিন্ধু লিপির অক্ষরকে নির্দেশ করে: "ইউনিকর্ন" (বাম), ষাঁড় (মাঝে), এবং হাতি (ডান)



সিন্ধু সভ্যতার মানুষের ধর্ম ও বিশ্বাস অনেকাংশেই পরবর্তী ভারতীয় ধর্মের ধর্মীয় রীতি অনুসারে দেবতাদের পূর্বসূরীদের চিহ্নিত করা যায়। 
হরপ্পান স্থান থেকে প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণের হিন্দু ব্যাখ্যার প্রবণতা স্থাপনকারী ক্ষেত্রের প্রাথমিক ও প্রভাবশালী সমীক্ষাটি জন মার্শালের ছিল, যিনি ১৯৩১ সালে নিম্নলিখিত বিষয়গুলিকে সিন্ধু ধর্মের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হিসাবে চিহ্নিত করেছিলেন, একজন মহান পুরুষ ঈশ্বর এবং একজন মাতৃদেবী; প্রাণী ও উদ্ভিদের দেবীকরণ বা পূজা; ফ্যালাস (লিঙ্গ) ও ভালভা-এর (যোনি) প্রতীকী উপস্থাপনা; এবং ধর্মীয় অনুশীলনের মধ্যে স্নানজলের ব্যবহার। যদিও মার্শালের দেওয়া উদাহরণ ও তার পরিপ্রেক্ষিতে দেওয়া ব্যাখ্যাগুলি বিতর্ক ও দ্বন্দ্বের সৃষ্টি করেছিল।
১৮৭২-৭৫ সালে আলেকজান্ডার কানিংহাম প্রথম হড়প্পা সিলমোহর প্রকাশ করেন। এর প্রায় অর্ধশতাব্দী পর, ১৯১২ সালে জে. ফ্লিট আরও কতকগুলি হরপ্পা সিলমোহর আবিষ্কার করেন। এই সিলমোহর দেখে উদ্বুদ্ধ হয়ে ১৯২১-২২ সালে স্যার জন মার্শাল এই অঞ্চলে প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্য অভিযান চালান। এই অভিযানের ফলশ্রুতি হিসাবে জন মার্শাল, দয়ারাম সাহানি ও মাধোস্বরূপ ভাট হরপ্পা এবং রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, ই. জে. এইচ. ম্যাককি ও স্যার জন মার্শাল মহেঞ্জোদাড়ো আবিষ্কার করেন। ১৯৩১ সালের মধ্যেই মহেঞ্জোদাড়োর অধিকাংশ প্রত্নস্থল আবিষ্কৃত হয়ে গিয়েছিল। তা সত্ত্বেও, পরবর্তীতে খননকার্য অব্যাহত থাকে।
ভারত বিভাগের পর সিন্ধু সভ্যতার বেশিরভাগ অংশ প্রত্নস্থল পাকিস্তান রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত হয়। বর্তমানে পাকিস্তানের ভূখণ্ডই ছিল এই সভ্যতার মূল কেন্দ্র। ১৯৪৯ সালে পাকিস্তান সরকারের পুরাতাত্ত্বিক বিভাগের উপদেষ্টা স্যার মর্টিমার হুইলার এই সমস্ত অঞ্চলে খননকার্য চালান। সিন্ধু সভ্যতার সীমান্তবর্তী প্রত্নস্থলগুলি আবিষ্কৃত হয়েছে পশ্চিমে বালুচিস্তান এবং উত্তরে আফগানিস্তানের আমুদারিয়া বা অক্সাস নদীর তীরবর্তী শোর্তুগাই অঞ্চলে।

                   সিন্ধু সভ্যতার শিংযুক্ত দেবতার মৃৎপাত্র





চিত্রঋণ: ইন্টারনেট 

Comments

Post a Comment

Popular posts from this blog

একনজরে জেনে নিন কেমন ছিল ফিনিশীয় সভ্যতার ইতিহাস

একনজরে জেনে নিন মেসোপটেমিয়া সভ্যতার ইতিহাস

একনজরে জেনে নিন কেমন ছিল সুমেরীয় সভ্যতার ইতিহাস