একনজরে জেনে নিন কেমন ছিল রোমান সভ্যতার ইতিহাস

রোমান সভ্যতা:-




প্রাচীন রোমান সভ্যতা পৃথিবীর সমৃদ্ধতম প্রাচীন সভ্যতাগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি যার প্রথম উত্থান ঘটে খ্রিষ্টপূর্ব অষ্টম শতাব্দীর প্রথমভাগে ইতালীয় উপদ্বীপে। রোম শহরকে কেন্দ্র করে ভূমধ্যসাগরের তীর বরাবর এই সভ্যতা বিকাশিত হতে থাকে, এবং কালক্রমে এটি প্রাচীন যুগের বৃহত্তম সাম্রাজ্যে পরিণত হয়।
এই সভ্যতার স্থায়ীত্ব ছিল প্রায় বারো শতক এবং দীর্ঘ সময়ের পরিক্রমায় রোমান সভ্যতা একটি রাজতন্ত্র থেকে সম্ভ্রান্ত প্রজাতন্ত্র এবং পরবর্তীতে একটি একনায়কতন্ত্রী সাম্রাজ্যে পরিণত হয়। যুদ্ধজয় এবং ক্ষমতা প্রয়োগের মাধ্যমে এটি দক্ষিণ ইউরোপ, পশ্চিম ইউরোপ, এশিয়া মাইনর, উত্তর আফ্রিকা, উত্তর ইউরোপ এবং পূর্ব ইউরোপের একাংশকে এই শাসনাধীনের অন্তর্ভুক্ত করেছিল।

                       মানচিত্রে রোমান সভ্যতার অবস্থান



শুরুর দিকে রোমান সভ্যতা ছিল অনেকগুলো নগর রাষ্ট্রের সমষ্টি যা ছিল অনেকটা কনফেডারেশন প্রকৃতির। ইহা রোমান রিপাবলিক নামে পরিচিত। নির্বাচিত ও নির্ধারিত প্রতিনিধিদের পরামর্শে চলত রোমের শাসনব্যবস্থা। সেই যুগকে বলা হয় রোমের রিপাবলিকান তথা প্রজাতান্ত্রিক যুগ। কালক্রমে রোম প্রজাতন্ত্র থেকে রূপ নেয় রাজতন্ত্রে। প্রজাতন্ত্রের স্থায়িত্বকাল ছিল প্রায় পাঁচশ বছর, আর রাজতন্ত্র বজায় ছিল পরবর্তী পনেরশ বছর। সব মিলিয়ে এই দুই সহস্রাব্দে মানব ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থান জুড়ে ছিল রোমান সাম্রাজ্য, যার ফলাফল এই আধুনিক যুগের বিভিন্ন ক্ষেত্রে এখনও ধারাবাহিকভাবে রয়ে গেছে।
যুদ্ধ বিগ্রহ, অভ্যুত্থান, পাল্টা অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সমৃদ্ধির দিকে ক্রমশ অগ্রায়মান রোমান রিপাবলিকে ডিক্টেটরদের আবির্ভাব ঘটতে থাকে। জুলিয়াস সিজার রোমের অত্যন্ত পরাক্রমশালী ডিক্টেটর হিসাবে ক্ষমতায় আসেন। তার মৃত্যুর পর তার পালক পুত্র অগাস্টাস সিজার রোমের সিংহাসন আরোহণ করেন। তিনি রিপাবলিকানদের চূড়ান্তভাবে পরাজিত করেন এবং রোম প্রজাতন্ত্রের চিরতরে বিলুপ্ত হয় এবং প্রতিষ্ঠিত হয় স্বৈরাচারী রোমান সাম্রাজ্যের। সেই হিসাবে রোমান সাম্রাজ্যের প্রথম সম্রাট ছিলেন অগাস্টাস সিজার। অগাস্টাস সিজার নিজের নামানুসারেই তিনি তার জন্মমাসের নাম আগস্ট রেখেছিলেন এবং তার পিতা জুলিয়াস সিজার নামকরণ করেছিলেন নিজের জন্মমাস জুলাইয়ের।

                            অগাস্টাস সিজারের মূর্তি 



 প্রথম আটশ বছর রোমানরা ছিল প্যাগান তথা পৌতলিক। রোমানদের প্রধান দেবতা জুপিটার। এদিকে ফিলিস্তিনে যীশু খ্রিস্টের জন্মের সময় রোমের ক্ষমতায় আসীন হন অগাস্টাস সিজার। ভৌগলিকভাবে মিশরের অদূরে ছিল ফিলিস্তিনের অবস্থান। তাই ঐতিহাসিকভাবে মিশরফিলিস্তিন একই সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল ইতিহাসের অধিকাংশ সময়।
যীশু খ্রিস্টের একত্ববাদের শিক্ষা ছিল রোমান বহু ঈশ্বরবাদের সাথে সম্পূর্ণরূপে সাংঘর্ষিক, তাই প্রথমদিকে রোম ছিল খ্রিস্টধর্মের সবচেয়ে বড় শত্রু। খ্রিস্টানদের প্রবর্তিত ও প্রচারিত সাম্যইনসাফের শিক্ষা ভোগবাদে বিশ্বাসী অত্যাচারী রোমান সাম্রাজ্যে অশান্তির বাতাবরণ তৈরী করেছিল। এই কারণে প্রাথমিক যুগের খ্রিস্টানদের উপর অমানুষিক অত্যাচার করতে থাকে রোমানরা। কিন্তু তা সত্ত্বেও জনপ্রিয় হতে থাকে খ্রিষ্টধর্ম।  এরও প্রায় ৭০ বছর পরে সম্রাট থিওডোসিয়াসের সময় খ্রিস্টধর্মকে রোমের একমাত্র বৈধ রাজধর্মের মর্যাদা দেওয়া হয়েছিল। 

         রোমানদের হাতে অত্যাচারিত খ্রিষ্টধর্মের অনুগামীরা



এ সময়ে শিক্ষা বলতে খেলাধুলার বিষয় বীরদের স্মৃতিকথা আলোচিত হত। যুদ্ধকেন্দ্রীক সভ্যতা হওয়া সত্ত্বেও সাংস্কৃতিক দিকে এদের আগ্রহ ছিল। অনেকেই গ্রিক সাহিত্যকে লাতিন ভাষায় অনুবাদ করার দক্ষতা অর্জন করে। রােমের অভিজাত যুবকরা গ্রিসের বিভিন্ন বিদ্যাপীঠগুলিতে শিক্ষালাভ করত। সে যুগে মিলনাত্মক নাটক রচনার দ্বারা সাহিত্যে অবদান রাখেন উল্লেখযোগ্য দুই সাহিত্যিক প্লুটাসটেরেন্স। সাহিত্য ক্ষেত্রে সবচেয়ে উন্নতি দেখা যায় অগাস্টাস সিজারের সময়। সেই যুগের কবি হিসাবে ওভিদ, লিভি হােরাস, ভার্জিল প্রমুখেরা যথেষ্ট খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। ভার্জিলের মহাকাব্য ‌‌’ইনিড’ বহু ভাষায় অনুবাদিত হয়েছে। 
রােমান স্থাপত্যের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল এর উচ্চতাবিশালতা। সম্রাট হার্ডিয়ানের নির্দেশে তৈরী ধর্মমন্দির প্যানথিয়ন রােমানদের স্থাপত্যের এক অসাধারণ নিদর্শন । ৮০ খ্রিষ্টাব্দে রােমা সম্রাট টিটাস কর্তৃক ৫৬০০ দর্শকাসন বিশিষ্ট কলােসিয়াম নাট্যশালা নির্মাণ করা হয়। স্থাপত্যকলার পাশাপাশি রােমান ভাস্কর্যেরও যথেষ্ট উৎকর্ষ সাধিত হয়েছিল। রােমান ভাস্করগণ মার্বেল পাথরের দেব-দেবী, সম্রাট, দৈত্য, পুরাণের বিভিন্ন চরিত্রের মূর্তি নিপুণভাবে তৈরী করতে পারত।
বিজ্ঞানীদের মধ্যে কেউ কেউ গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হন। তাদের মধ্যে প্লিনি বিজ্ঞান সম্পর্কে বিশ্বকোষ প্রণয়ন করেন। এতে প্রায় পাঁচশ বিজ্ঞানীর গবেষণাকর্মএর অবদান স্থান পেয়েছে। তাছাড়া চিকিৎসা বিজ্ঞানে রােমানদের অবদান ছিল । বিজ্ঞানী সেলসাস চিকিৎসা বিজ্ঞানের ওপর বিভিন্ন বই লেখেন। এছাড়া চিকিৎসাশাস্ত্রে গ্যালেন রুফাসে অসামান্য অবদান রেখেছেন।
 রোমান সভ্যতা ধ্বংস করে নর্ডিক জাতি কর্তৃক।

                    কলােসিয়াম নাট্যশালার ধ্বংসাবশেষ 



চিত্রঋণ: ইন্টারনেট 

Comments

Post a Comment

Popular posts from this blog

একনজরে জেনে নিন কেমন ছিল ফিনিশীয় সভ্যতার ইতিহাস

একনজরে জেনে নিন মেসোপটেমিয়া সভ্যতার ইতিহাস

একনজরে জেনে নিন কেমন ছিল সুমেরীয় সভ্যতার ইতিহাস