একনজরে জেনে নিন কেমন ছিল ব্যাবিলনীয় সভ্যতার ইতিহাস

ব্যাবিলনীয় সভ্যতা:-



ব্যাবিলন শব্দটির উৎপত্তি হয়েছে “বাব ইল” শব্দ থেকে যার অর্থ- দেবতার নগর। আরব ঐতিহাসিকগণ এই উন্নত উপত্যকাভূমিকে সভ্যতার জন্মভূমি নামে অভিহিত করেছেন।
 নৃপতি দুঙ্গীর মৃত্যুর পরবর্তী সময়ে, সুমেরীয় সভ্যতা পতনের পর যে ইতিহাস প্রসিদ্ধ সভ্যতা তথা সাম্রাজ্যের উদ্ভব ঘটে; সেটিই ছিল ব্যাবিলনীয় সভ্যতা। কালক্রমে এই সভ্যতা সমগ্র দক্ষিণ মেসােপটেমিয়া পর্যন্ত বিস্তৃতি লাভ করে।
 আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৩০০০ অব্দে সেমেটিক জাতির একটি শাখা টাইগ্রীসইউফ্রেটিস (দজলাফোরাত) উপত্যকায় গমন করে স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করে সুমেরীয়দের কাছে গৃহ নির্মাণ, জলসেচ, লিখন পদ্ধতি প্রভৃতি সম্পর্কে প্রভূত জ্ঞান লাভ করে। অতঃপর কালক্রমে অ-সেমেটিক সুমেরীয় জাতি এবং সেমেটিক জাতির সংমিশ্রণে ব্যাবিলনীয় সভ্যতার উৎপত্তি এবং ক্রমবিকাশ ঘটে। 

                   মানচিত্রে ব্যাবিলনীয় সভ্যতার বিস্তৃতি 



গ্রিক, প্যালেস্টাইন ও ইটালির ন্যায় এই অঞ্চলটিও ছিল প্রাচীরবেষ্টিত অসংখ্য নগর, রাষ্ট্রের সমষ্টি। রাজ্যগুলাের মধ্যে রাজনৈতিক ঐক্য বিদ্যমান না থাকায় সেগুলি প্রভুত্ব স্থাপন করার জন্য পরপর সংগ্রামে লিপ্ত থাকত। রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমেই প্রথম সারগন আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ২৮০০ অব্দে সুমেরীয়দের পরাজিত করে ব্যাবিলনীয় সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার খ্যাতি অর্জন করেন।
সেমেটিক জাতির অপর একটি শাখা সিরিয়া থেকে অগ্রসর হয়ে সুমার-আক্কাদ সাম্রাজ্যের দক্ষিণাঞ্চল অধিকার করে। এরা ইতিহাসে আমােরাইট নামে পরিচিত। এই বংশের সর্বশ্রেষ্ঠ নরপতি হাম্মুরাবি (খ্রিস্টপূর্ব ২১২৩–২০৮১ অব্দ) ব্যাবিলনে কেন্দ্রীয় শাসন প্রতিষ্ঠা এবং সম্প্রসারণ নীতি গ্রহণ করে একটি শক্তিশালী ও সংঘবদ্ধ সাম্রাজ্য স্থাপন করেন। শাসন-সংগঠক, সুদক্ষ আইনবিদ ও বিজ্ঞ শাসক হিসেবে এবং ব্যাবিলনীয় সভ্যতার উন্মেষ ও ক্রমবিকাশে অপরিসীম অবদান রেখে প্রাচীন বিশ্বের ইতিহাসে তিনি অম্লান স্বাক্ষর রেখে গেছেন। 
 হাম্মুরাবি শুধুমাত্র একটি বিরাট সাম্রাজ্যের শাসকই ছিলেন না, তিনি একটি বিখ্যাত আইন সংহিতা প্রণয়ন করে ইতিহাসে অমরত্ব লাভ করেছেন। প্যারিসের ল্যুভর যাদুঘরে সংরক্ষিত এ দলিল অর্থাৎ শিলালিপি “হাম্মুরাবির আইন" বা আইন সংহিতা নামে খ্যাত। সুমেরীয় রাজা দুঙ্গীর রচিত আইনের উপর ভিত্তি করে প্রবর্তিত হলেও হাম্মুরাবির আইন মনুষ্য প্রণীত আইন সংহিতার মধ্যে সবচাইতে প্রাচীন ও প্রসিদ্ধ।
হাম্মুরাবির আইন সম্বলিত প্রস্তরটি ৮ ফুট উঁচু মসৃণ ব্যাসেল্ট পাথর এবং আকৃতিগতভাবে স্তম্ভের উপরের দিকটা স্থূলভাবে বৃত্তাকার। হাম্মুরাবি প্রার্থনার ভঙ্গিতে সিংহাসনে উপবিষ্ট সামাস দেবতার সামনে দাড়িয়ে রয়েছেন। অতঃপর দেবতা সামাস তাকে এ আইন সংহিতা উপহার হিসেবে দেন–এরূপ একটি দৃশ্য উক্ত স্তম্বে খােদিত রয়েছে। স্তম্ভের বাকি অংশের সামনে ও পিছনে দু’দিকে সংবাদপত্রের মতাে সারিতে ২৮২ টি আইন শুদ্ধ ব্যাবিলনীয় ভাষায় খােদিত রয়েছে যাতে নানা প্রকার আইনভঙ্গের শাস্তি, ব্যবসায়-বাণিজ্য, বিবাহ, পরিবার, সম্পত্তি, বৃত্তিধারী লোকদের পারিশ্রমিক ও দায়িত্ব, কর্তব্য, কৃষিবিষয়ক আইনগত সমস্যা, ভাড়ার হার এবং পরিমাণ, বিভিন্ন দ্রব্যাদির মূল্য, ক্রয়-বিক্রয়ের নীতিমালা ইত্যাদি সংক্রান্ত। সাম্রাজ্যের সকল শ্রেণির জনগণের অধিকার সম্পর্কে নির্দেশ এতে দেওয়া আছে। চোখের বদলে চোখ’, ‘দাঁতের বদলে দাঁত' ইত্যাদি অত্যন্ত কঠোর ফৌজদারী দণ্ডবিধির কথা এতে উল্লেখ রয়েছে। এর এক দীর্ঘ উপসংহারে বলা হয়েছে—“যে সুযােগ্য রাজা হাম্মুরাবি প্রতিষ্ঠিত এ ন্যায় আইন সংহিতা উৎকীর্ণ স্তম্ভের ক্ষতিসাধন অথবা পরিবর্তন করবে, তার উপর দৈব অভিশাপ নেমে আসবে।” প্রায় ২০০০ বছরের অধিক সময় ধরে এই আইন সংহিতাটি জারি ও সম্পূর্ণভাবে কার্যকর ছিল। 

                                        হাম্বুরাবি 



দজলা ও ফোরাত নদীর উপত্যকা অত্যন্ত উর্বর থাকায় কৃষিকার্যে ব্যাবিলনবাসী প্রভূত উন্নতি সাধন করেছিল। বন্যার প্রকোপ থেকে শস্যক্ষেত্র রক্ষার জন্য এবং অনাবৃষ্টির সময় ভূমিতে জলসেচের জন্য উপযুক্ত বাঁধ নির্মাণ করা হয়। ঐতিহাসিক হেরােডােটাস এ অঞ্চলের শস্যের প্রাচুর্য এবং কৃষি ব্যবস্থার সুনাম করেন। কৃষিকার্যে অবহেলা কিংবা খাল খনন ও বাঁধ নির্মাণে অবহেলার জন্য কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা ছিল। সামন্ত ভূমি ব্যবস্থায় কৃষকগণ উৎপন্ন শস্যের দুই-তৃতীয়াংশ জমির মালিককে দিতে বাধ্য থাকতাে।
ব্যবসায়-বাণিজ্যেও তারা উন্নতিসাধন করে ছিল। হাম্মুরাবির আইনের নির্দেশ অনুযায়ী জানা যায় যে, অসাধুঅতিরিক্ত মুনাফাখাের ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা ছিল। নির্দিষ্ট ওজন ও পরিমাপ প্রণালি ব্যাবিলনে প্রচলিত ছিল। হিসাব রক্ষার এক নির্ভুল পদ্ধতিও তারা আবিষ্কার করেছিল। ব্যবসার বাণিজ্য, ব্যাংক, শিল্প সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন ছিল। তারা উদ্বৃত্ত শস্য, তেল, খেজুর, মুয়পাত্র, কাচ, চামড়া ইত্যাদি রপ্তানি করতাে এবং স্বর্ণ, রৌপ্য, সীসা ইত্যাদি আমদানি করতাে। ভারতীয় উপমহাদেশের হরম্পা ও মহেঞ্জোদরো এবং মিশরের সাথে ব্যাবিলনীয়দের বাণিজ্যিক সম্পর্ক ও যােগাযােগ বিদ্যমান ছিল বলে জানা যায়। 
গদ্য ও পদ্য সাহিত্যেও তারা কৃতিত্ব অর্জন করেছিল। জনপ্রিয় বিখ্যাত ‘গিলগামেশ উপাখ্যান’ সুমেরীয়দের নিকট থেকে সংগ্রহ করে ব্যাবিলনের কবিগণ অপূর্ব সাহিত্য সৃষ্টি করেন। মহাকাব্য ও পৌরাণিক কাহিনী সম্বলিত সাহিত্য রচনায় তারা ছিল সিদ্ধহস্ত। 
ফরাসি প্রত্নতত্ত্ববিদগণ খননকার্য পরিচালনা করে ১৮৯৪ সালে একটি ব্যাবিলনীয় স্কুলের ধ্বংসাবশেষ উদ্ধার করেন। স্কুলটি ছিল ৫৫০ বর্গফুট আয়তনবিশিষ্ট এবং বর্গাকার। এ স্কুলে সম্ভবত প্রায় ৩৫০টি চিহ্ন মুখস্থ করতে হতাে এবং লিখন পদ্ধতি সম্পর্কে শিক্ষাদান করার ব্যবস্থা ছিল। প্রতিষ্ঠানটির দেয়ালে লেখা ছিল— “ফলকে লিখন পদ্ধতিতে যে উৎকর্ষ সাধন করবে, সে সূর্যের ন্যায় উজ্জ্বল হবে।” 
চিত্র ও অঙ্কনবিদ্যায়ও তারা দক্ষ ছিল। পাথর, চুনাপাথর এবং ধাতব বস্তুর উপর তারা খােদাই করে সুন্দর মূর্তি এবং প্রতিকৃতি অঙ্কন করতাে। মাটি ও পাথরের বাসন-পত্রের গায়ের কারুশিল্প তাদের উন্নতমানের শৈল্পিক চিন্তাধারা বহন করে। এগুলাে ছাড়াও বিভিন্ন ধরনের মােহর, অলঙ্কার এবং ব্যাবহৃত রক্ষাকবচে ব্যাবিলনীয় সভ্যতার রূপ অনুধাবন করা যায় । 

                               গিলগামেশের মূর্তি



মিশরীয়দের ন্যায় প্রাচীন ব্যাবিলনে “কিউনিফর্ম" নামে কীলক আকারে এক অভিনব লিখন পদ্ধতি প্রচলিত ছিল। নিঃসন্দেহে এটি প্রাচীন মিশরীয় এবং সুমেরীয় “চিত্র-লিখন" পদ্ধতি অপেক্ষা উন্নততর ছিল। পাথরে খােদাই করে অথবা মাটির থালাতে তিনকোণা কাঠি দিয়ে লেখা পাত রৌদ্রে শুকিয়ে বা আগুনে পুড়িয়ে নেওয়া হতো।  তারা প্রায় ৫০০টির বেশি অক্ষরের ব্যবহার করত।

                       ব্যাবিলনীয় কিউনিফর্ম ট্যাবলেট 



প্রাচীন ব্যাবিলনরা বহু দেব-দেবীর পূজা-অর্চনা করতাে। সূর্যদেব মারদুক ছিল তাদের সর্বশ্রেষ্ঠ দেবতা। এ ছাড়া তারা প্রণয়ের দেবী ইসতার, বায়ুর দেবতা মারুত্তস এবং এছাড়াও অসংখ্য ছােটখাট দেব-দেবীর পূজা হতো। অশরীরী প্রেতাত্মার শক্তিতেও তাঁরা বিশ্বাস করত। তাদের অন্ধ কুসংস্কারে আচ্ছন্ন ধর্মবিশ্বাস থেকেই জ্যোতিষ শাস্ত্রের উঠপত্তি লাভ ও প্রসার ঘটেছিল। ভবিষ্যৎ গণনায় তারা বিশেষ পারদর্শী ছিল। 
তারা নিজস্ব এবং অন্যান্য জাতির পৌরাণিক কাহিনী এবং লৌকিক উপাখ্যানগুলি সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করে “হিব্রুবাইবেলের পটভূমি রচনা করে। তারা সমালােচনামূলক এবং বিস্তৃতভাবে পর্যবেক্ষণ পরিচালনা করে অঙ্ক-শাস্ত্র, জ্যোতির্বিদ্যা, ভূতত্ত্ববিদ্যা, ইতিহাস, চিকিৎসাবিদ্যা, ব্যাকরণ, দর্শন এবং অভিধান সংকলনের ভিত্তি রচনা করে গেছেন। তাদের মহাকাব্য, ধর্মীয় গীতি, প্রবাদ ইত্যাদিরও প্রবর্তক বললে অত্যুক্তি করা হবে না। প্রকৃতপক্ষে জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় গভীর জ্ঞান অর্জনের অজানা পথের সন্ধান বিশ্ববাসীকে তারাই প্রথম দান করে গেছেন। তাদের জ্ঞান-বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে অবদান পরবর্তী শতাব্দীগুলাের অনুসন্ধিৎসু পণ্ডিত ও গবেষকদের গবেষণা পরিচালনা করার পথ রচনা করে গেছেন। এক কথায় বলা যায়, আধুনিক সভ্যতা প্রাচীন কালের ব্যাবিলনীয় সভ্যতার কাছে বিশেষভাবে ঋণী। 
ব্যাবিলনে জ্যোতির্বিদ্যা, গণিতশাস্ত্র এবং আয়ুর্বেদ শাস্ত্রের চর্চা হতাে। চন্দ্র, সূর্য, গ্রহ-নক্ষত্রাদি সম্পর্কে তারা যথেষ্ট জ্ঞান অর্জন করেছিল। সূর্যঘড়িজলঘড়ি ব্যবহার করে তারা সময় নির্ধারণ করত। চন্দ্রগ্রহণ ও সূর্যগ্রহণ সম্পর্কেও তাদের সঠিক ও সংগত ধারণা ছিল। তাদের তৈরি ব্যাবিলনীয় পঞ্জিকা মিশরীয় পঞ্জিকা অপেক্ষা অনেকাংশে উন্নতমানের ছিল। তারা দশমিক গণনা পদ্ধতি আবিষ্কার করে অঙ্কশাস্ত্রে মৌলিক অবদান রেখেছে। ব্যাবিলনীয়রা ওজন, দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, শক্তি পরিমাপক প্রথার উদ্ভাবন করার গৌরব ও কৃতিত্ব অর্জন করে। 
চিকিৎসা বিদ্যায়ও তারা শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে। সেই যুগে তাদের দেশে কমপক্ষে ৫০০ রকম ওষুধের প্রচলন ছিল। ঐতিহাসিক জে. ই. সােয়াইন বলেন, “তারা সূর্যমুখীর বীজকে দাঁত ব্যথার জন্য, দুধকে পেটের অসুখ নিরাময়ের কার্যে ব্যবহার করত।
 

                                         সূর্যঘড়ি 




চিত্রঋণ: ইন্টারনেট 

Comments

Post a Comment

Popular posts from this blog

একনজরে জেনে নিন কেমন ছিল ফিনিশীয় সভ্যতার ইতিহাস

একনজরে জেনে নিন মেসোপটেমিয়া সভ্যতার ইতিহাস

একনজরে জেনে নিন কেমন ছিল সুমেরীয় সভ্যতার ইতিহাস