একনজরে জেনে নিন কেমন ছিল সুমেরীয় সভ্যতার ইতিহাস

সুমেরীয় সভ্যতা:-



আজকের যুগের টাইগ্রীস ও ইউফ্রেটিস (তৎকালীন সময়ের দজলা ও ফোরাত) নদীর মধ্যবর্তীর উর্বর ভূমিতে সুমেরীয় সভ্যতার উত্থান ঘটে। অর্থাৎ, এশিয়ার পশ্চিমাংশের মেসোপটেমিয়া অঞ্চলে প্রথম যে সভ্যতা গড়ে উঠে সেটাই সুমেরীয় সভ্যতা, এই কারণেই সুমেরীয় সভ্যতাকে মেসোপটেমিয়া সভ্যতার স্রষ্টা বলা হয়ে থাকে। সুমেরীয় সভ্যতা যেমন প্রাচীন, তেমনি এই সভ্যতার বৈশিষ্ট্য অন্য মাত্রায় পৌঁছে গেছে। উন্নত লিখন পদ্ধতির আবিষ্কার এই সভ্যতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ অবদান। 
প্রায় ২০০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে সুমেরীয় সভ্যতার নাম অজানা ছিল । ১৮৩৪ সালে প্রত্মতাত্ত্বিক গবেষকরা সর্বপ্রথম এই সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কার করেন। অধ্যাপক ক্রামারের নির্দেশে সর্বপ্রথম একদল প্রত্নতত্ত্ববিদ এই অঞ্চলের অধিবাসীদের সম্পর্কে প্রচুর তথ্য সংগ্রহ করতে সচেষ্ট হন। গবেষণার দ্বারা ধারণা করা হয় ৫০০০ থেকে ৪০০০ খৃষ্টপূর্বাব্দে মেসোপটেমিয়ায় সুমেরীয়রা বসবাস করতো।

                    মানচিত্রে সুমেরীয় সভ্যতার বিস্তৃতি 



সুমেরীয় সভ্যতায় যুদ্ধবাদী রাজতান্ত্রিক শাসনতন্ত্র প্রচলিত ছিল। রাজার নেতৃত্বে অভিজাতদের নিয়ে গঠিত কাউন্সিলের সভা পুরােহিত প্রশাসনের নির্দেশে চলত। এই কাজে বিভিন্ন উচ্চ থেকে নিম্নপদস্থ ব্যক্তি, যেমন- আমলা, সেনাপতি, প্রহরী, জল্লাদ প্রভৃতির সহায়তা এবং মতামত নেওয়া হতো। ফলে এখানকার নাগরিকরা যথেষ্ট সুশাসন ও স্বাধীনতা ভোগ করতো। 
আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রেও সুমেরীয়দের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। স্থানীয় ঐতিহ্য, প্রথা মেনেই এবং সেমেটিক গোষ্ঠীর রীতিনীতি অনুযায়ী সুমেরীয় আইন প্রণীত হতো। ক্ষুদ্র নগর রাষ্ট্রের সমষ্টি ছিল এই সভ্যতার বিশেষ আকর্ষণ। পরবর্তী সময়ে ব্যাবিলনীয়, এসেরিয় ক্যালাদীয় এবং হিব্রু আইন সুমেরীয় আইনের ধারা অনুযায়ী রচিত হয়। বিখ্যাত আইনি গ্রন্থ হাম্বুরাবীর আইন সংকলন সুমেরীয় আইনের একটি উন্নত ও সংশোধিত সংস্করণের উদাহরণ।
সুমেরীয়দের আইনের প্রধান দিক ছিল- অপরাধীকে তার কৃত অপরাধের জন্য উপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা করা। একধরনের বিচার আদালত বিদ্যমান ছিল, যেখানে বাদী বিবাদী উভয় পক্ষকেই হাজির থাকতে হতো।
ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয়সামাজিক মর্যাদার প্রতি বিশেষ নজর দেওয়া হতো। সামরিক বাহিনীর বিচারকার্য তুলনামূলক ভাবে কঠোর ছিল। অথচ সামরিক বাহিনীতে একমাত্র অভিজাত বংশোদ্ভুতদের অংশগ্রহণ করার সুযোগ ছিল।
রাজা প্রথম সারগন (খ্রি.পূ. ২৩৭০ – খ্রি.পূ. ২৩১৫)-এর আমলে আক্কাদিয়রা সুমেরের অধিকার কায়েম করে নেয়। রাজা সারগনের খ্যাতি তখন আরও বেশি ছড়িয়ে পড়ে।
অন্যান্য সমাজের মতো সুমেরীয় আইনও গড়ে উঠেছিল তাদের সামাজিক বিধি ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে। সুমেরীয়দের বিখ্যাত সম্রাট ‘ডুঙি’ প্রথম আইন সংকলন করেন। তবে, সুসভ্য জাতি হওয়া সত্ত্বেও সুমেরীয়রা সুশৃংখল রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে সক্ষম হয়নি।

                  আক্কাদিয় রাজা সর্গানের আবক্ষ মূর্তি



প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন গবেষণা করে যেটুকু তথ্য জানা যায়- সুমেরীয়রা ৪০০০ খৃষ্টপূর্বাব্দের দিকে উত্তর পূর্বাঞ্চল বিশেষত এলামের পাহাড়ি অঞ্চল থেকে উর্বর ভূমির দিকে ক্রমশ অগ্রসর হয়েছিল। মূলত উৎসস্থলের জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে সুমেরীয়দের একটি গোষ্ঠী উর্বর কৃষি ভূমির সন্ধ্যানে অগ্রসর হয়ে মেসোপোটেমিয়া এসে পৌঁছেছিল। কৃষিকাজের উপযুক্ত জমি থাকার কারণে এরা মেসোপটেমিয়ার দক্ষিণের নিন্মাঞ্চলগুলিতে বসতি গড়ে তুলেছিল। এই উর্বর ভূমিতে কৃষির উপর ভিত্তি করে প্রাচীনকালে অনেক উন্নত সভ্যতা গড়ে উঠেছিল। সুমেরীয়দের নাম অনুযায়ী এই অঞ্চল সুমের নামে পরিচিত ছিল।
সভ্যতার প্রাথমিক ধারণা পাওয়া যায় মেসোপটেমিয়া অঞ্চলে বসবাসকারী সুমেরীয়দের মাধ্যম। উর্বর কৃষি ভূমিতে এসে জীবন যাপনের সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজনে অনেক কিছু অর্জন, নতুনত্ব সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া সুমেরীয়দের আবিষ্কারের মধ্যে থেকেই সভ্যতার এক অনন্য ধারা শুরু হয়।
সুমেরীয় সভ্যতার সর্বত্র লিখনপদ্ধতি ব্যবহৃত হয়েছে। তারা লিখন প্রক্রিয়া সম্পন্নের পর এসব মাটির চাকতিগুলো রোদে অথবা আগুনে পুড়ে সংরক্ষণ করতো। পরবর্তীতে এ সভ্যতার প্রায় ৫০০০০ মাটির চাকতি আবিষ্কৃত হয়েছে। সুমেরীয় ভাষায় ৫০০ এরও বেশি সাংকেতিক চিহ্ন ছিল। দুর্বোধ্য হওয়ার কারণে এই লিখন পদ্ধতি সহজে সকলের পক্ষে আয়ত্ত্ব করা সম্ভব ছিল না। ফলে শিক্ষা গ্রহণের অধিকার সার্বজনীন না হয়ে পুরোহিত, কেরানি এদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। এছাড়া পোড়ামাটির অলংকার, পাত্র তাদের শিল্পের পরিচয় ছিল। বস্ত্র বয়ন শিল্পে এই সভ্যতার উন্নতির চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছেছিল।
সুমেরীয় পৌরাণিক কাহিনী, স্তবগান, শোকগাথা ও সমসাময়িক ঘটনাবলীর বর্ণনা থেকে জানা যায়, সুমেরীয় দের মধ্যেও সাহিত্যচর্চা যথেষ্ট মাত্রায় ছিল। তাদের লিখনপদ্ধতির মাধ্যমে তারা সেসব লিপিবদ্ধ করে রেখেছিল বলে পরবর্তীকালে তাদের সাহিত্যের কিছু অংশ হলেও পাঠোদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।
তাম্র-ব্রোঞ্জ যুগের এই সভ্যতায় সমাজ, সংস্কৃতি ও অর্থনীতি বিভিন্ন ক্ষেত্রে সুমেরীয়রা প্রভূত উন্নতিসাধন করেছিল। 

                       সুমেরীয় সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ 



সুমেরীয় সভ্যতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান তাদের লিখনপদ্ধতি আবিষ্কার। লিখিতভাবে আবিষ্কৃত পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন ভাষা সুমেরীয়। এই লিখনপদ্ধতি আবিষ্কারের পুর্বে মিশরের সুমেরীয় লিখনপদ্ধতি ছিল চিত্রভিত্তিক। এই চিত্রভিত্তিক লিখনপদ্ধতি কষ্টসাধ্য  দূর্বোধ্য ছিল। গবেষণা থেকে জানা যায়, লিপিতে পাওয়া সুমেরীয় ভাষা খৃষ্টপূর্ব ৫১০০ থেকে ৪৯০০ এর মধ্যে লেখা হয়েছিল। সুমেরীয় ভাষাতেই পৃথিবীর প্রথম মহাকাব্যিক কাহিনী ‘গিলগামেশ’ রচনা হয়েছিল।
 ভাষা, সাহিত্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সুমেরীয়রা তাদের ভাষা লিখে প্রকাশ করার যে লিখন পদ্ধতি আবিষ্কার করে তা ছিল শব্দ নির্ভর। প্রথমে ধারণা করা হয়, তারা একটি চিহ্নের দ্বারা একটি শব্দ প্রকাশ করত। পরবর্তীতে দেখা যায়, একটি চিহ্ন দিয়ে একটি শব্দ নয়, শব্দাংশ প্রকাশ করা হতো। তাদের প্রচলিত ভাষার নামেই শব্দের ধরণ লক্ষ্য করা যায়। সুমেরীয়রা তাদের স্থানীয় ভাষা অনুযায়ী নিজেদের ভাষাকে বলতো ‘এমে.ঙির’। চীনজাপানের ভাষা এখনো কিছুটা সুমেরীয় লিখনপদ্ধতির গঠনপ্রকৃতির মত।

          
                               সুমেরীয় লিখনপদ্ধতি 
  


অধিকাংশ প্রাচীন সভ্যতার ধর্মের মত সুমেরীয়রা বন্যা, খরা, দুর্ভিক্ষ, অনাবৃষ্টি সহ প্রাকৃতিক দূর্যোগের কারণে ভীত, সন্ত্রস্ত থাকত। তাই প্রকৃতির এইসব শক্তিকে সন্তুষ্ট রাখার জন্য তারা তাদের দেব দেবী হিসেবে পূজা করতো। তাদের বিশ্বাস ছিলো তাদের দেব-দেবী স্বতন্ত্র মানবীক গুণাবলির অধিকারী। তাদের ধারণা ছিল, দেব-দেবীদের সেবা করার জন্যই মানুষকে পৃথিবীতে আনা হয়েছে। শামাশ, এনলিল, ইশতার, নারগল, এনকি এরাই ছিল তাদের প্রধান দেব-দেবী।
সুমেরীয় দের প্রাচীন দেবতার নাম শামাশ বা সূর্য। তিনি পৃথিবীতে উত্তাপ ও আলো প্রদান করেন, এমনটাই ধারণা ছিল তাদের। আবার ইচ্ছে করলে অধিক উত্তাপ সৃষ্টি করে কচি ঘাস শুকিয়ে মেরে ফেলতে, এমনকি খরা সৃষ্টিও করতে পারতেন। এনলিল বৃষ্টি, বায়ু ও প্লাবনের দেবতা। ইশতার ছিলেন প্রেম ও উর্বরতার দেবী। নারগাল প্লেগ রোগের দেবতা। এনকি জলের দেবতা। এছাড়াও নগর রাষ্ট্র ভিত্তিক ও দেব-দেবী ছিল। যেমন- উরুক নগরীর দেবী ছিলেন ইনিনি। কিশ ও নাগাস এর দেবতা ছিলেন বিষাদের দেবী নিনকারগাস। এই সকল দেব-দেবীরা সূর্য দেবতা শামাশের মত ভালো মন্দ উভয়ই করতে পারতো বলে সুমেরীয়রা মনে করতো, তাই তারা সবসময় দেবতাদের সন্তুষ্ট রাখার চেষ্টা করতেন।
লিখনপদ্ধতি আবিষ্কার ইতিহাসে সুমেরীয়দের সর্বশ্রেষ্ঠ অবদান। সুমেরীয়রা সর্বপ্রথম বছরকে ১২ মাসে, দিন-রাত্রিকে ঘন্টায় এবং ঘন্টাকে মিনিটে বিভক্ত করেছিল। স্বর্ণ ঘড়ির আবিষ্কার সুমেরীয়দের দিন ও রাত্রির সময় নিরূপণে ব্যাপক ভূমিকা রাখে। যা তাদের জীবনযাত্রার মান সহজ করে তোলে। সুমেরীয়রা সর্বপ্রথম ২৪ ঘন্টায় ১ দিন ও ৭ দিনে ১ সপ্তাহ নিয়ম প্রবর্তন করে। এছাড়াও সুমেরীয়রা আরও বিভিন্ন ক্ষেত্রে, যথা- বিজ্ঞান, শিল্পকলা, স্থাপত্যবিদ্যায় বিশেষ অবদান রাখেন।

  
             শামাশের প্রতিনিধিত্ব: চিত্র অনুযায়ী দেখানো হয়েছে, তিনি তার সিংহাসনে বসে ন্যায়বিচার করছেন 




চিত্রঋণ: ইন্টারনেট 

Comments

  1. ভালো লেখনী

    ReplyDelete
  2. Nice and very interesting ✨

    ReplyDelete
  3. Nicely Written. Well done. Keep it up.

    ReplyDelete
  4. This comment has been removed by the author.

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular posts from this blog

একনজরে জেনে নিন কেমন ছিল ফিনিশীয় সভ্যতার ইতিহাস

একনজরে জেনে নিন মেসোপটেমিয়া সভ্যতার ইতিহাস