একনজরে জেনে নিন মেসোপটেমিয়া সভ্যতার ইতিহাস

মেসোপটেমিয়া সভ্যতা:-


মেসোপটেমিয়া বা সুমেরীয় সভ্যতাকে বিশ্বের প্রাচীনতম সভ্যতা বলে মনে করা হয়। মেসোপটেমিয়ার সভ্যতা টাইগ্রিস এবং ইউফ্রেটিস নদীর তীরে গঠিত হয়েছিল যা আজকের দিনে ইরাক এবং কুয়েত নামে পরিচিত। ঐতিহাসিকরা বিশ্বাস করেন যে সুমেরীয়দের ভারতচীনের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বেশ ভালো ছিল। নগরীকৃত দক্ষিণ ভূমিকে বলা হত সুমের এবং আক্কাদ এবং ভূমির প্রথম পরিচিত ভাষা ছিল সুমেরিয়ান। এই ভাষা টি 2400 খ্রিস্টপূর্বাব্দে আক্কাদিয়ান ভাষাভাষীদের আগমনের সাথে ক্রমশ আক্কাদিয়ানদের দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়।

                 মানচিত্রে মেসোপটেমিয়া সভ্যতার অবস্থান 



বহিঃশত্রুদের আক্রমণ থেকে খুব একটা সুরক্ষিত ছিল না বলে বারবার মেসোপটেমিয়ায় সভ্যতা পরিবেষ্টিত অঞ্চলগুলির উপর আক্রমণ চলতে থাকে এবং পরবর্তীতে এই সভ্যতার ওপর ভিত্তি করেই ব্রোঞ্জ যুগে আরও বিভিন্ন সভ্যতা উৎপত্তি লাভ করে।
খ্রিষ্টপূর্ব ১৫০ সাল নাগাদ মেসোপটেমিয়া পার্সিয়ানদের নিয়ন্ত্রণেই ছিল কিন্তু পরে এই ভূখন্ডের আধিপত্য নিয়ে রোমানদের সাথে যুদ্ধ হয় এবং রোমানরা এই অঞ্চল ২৫০ বছরের বেশি শাসন করতে পারেনি। দ্বিতীয় শতকের শুরুর দিকে পার্সিয়ানরা এই অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ কায়েম করে নেয় এবং সপ্তম শতাব্দী পর্যন্ত এই অঞ্চল তাদের শাসনেই থেকে যায়, এরপর মুসলিম শাসন শুরু হয়ে যায়। মুসলিম খিলাফত শাসনের দ্বারা এই অঞ্চলের নাম পরবর্তীতে হয় ইরাক

         ইরাকের 'জাখিকু' শহর: প্রায় ৩৪০০ বছর আগের জলাধারের তলায় হারিয়ে যাওয়া শহরটি বর্তমানে জলস্তর কমে যাওয়ার কারণে নতুন করে শহরটির হদিশ মেলে



পাথর না থাকায় অধিকাংশ ভবন ইট-কাদা দিয়ে তৈরী করা হয়েছে। মেসোপটেমিয়ার লোকেরা খাদ্য হিসাবে গম ও যবের রুটি, দুধ, দই, মাখন, ফল; পাশাপাশি মাংস ও মাছ ইত্যাদি গ্রহণ করত। এছাড়াও খেজুর থেকে বিশেষ ধরনের পানীয় এবং ওয়াইন তৈরী করত।
তারা তুলা, পশম ও ভেড়ার চামড়া দিয়ে তৈরি পোশাক পরতেন। পুরুষদের পোশাকের মধ্যে বিশেষ ভাবে লুঙ্গি ব্যবহারের চল তখনও ছিল, যা এখনও ভারতের অনেক প্রদেশে পরিধান করা হয়।
বাড়ি থেকে নোংরা জল নিষ্কাশনের জন্য নির্মিত ড্রেনগুলি মহেঞ্জোদারো এবং হরপ্পা শহরের মতোই ছিল।
পরদার ব্যবস্থাও ছিল, তবে তা রাজপরিবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।
এখানকার লোকেরা লেনদেন ও বাণিজ্যের জন্য মুদ্রা তৈরী করত, এবং পরিমাপ ও ওজন করার জন্য বিভিন্ন ধরনের ওজন পদ্ধতি ও যন্ত্র উদ্ভাবন করেছিল।
প্রথম দিকে তাদের চিত্রনাট্য ছিল ছবির উপর ভিত্তি করে, যা পরে শব্দের উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। নরম মাটির প্লেটে লেখার জন্য তারা খাগড়া কলম ব্যবহার করত।
মেসোপটেমিয়া সভ্যতা, বিশ্বের প্রথম সভ্যতা যা গণিত, জ্যোতিষশাস্ত্রে বিশেষ দক্ষতা অর্জন করেছিল।
মেসোপটেমিয়ানদের বিশ্বাস ছিল যে পৃথিবী একটি বিশাল ফাঁকবিশিষ্ট স্থানে অবস্থিত একটি গোলাকার চাকতি। তারা আরও বিশ্বাস করত যে আকাশে স্বর্গ এবং মাটির নিচে অর্থাৎ পাতালে রয়েছে নরক। প্রাচীন মেসোপটেমিয়ানরা বহুইশ্বরবাদে বিশ্বাসি ছিল, তবে সময়ের সাথে কিছু পৃথক গোষ্ঠির ধর্মমত পরিবর্তীত হতে শুরু করে। প্রাচীন মেসোপটেমিয়ানদের মধ্যে বিভিন্ন দেবদেবির মূর্তিপূজার প্রমান পাওয়া যায়।
ধর্ম পালনের দিক দিয়ে মেসোপটেমিয়া সভ্যতার মানুষেরা অনেক অগ্রগামী ছিলো। প্রতিটি জিগুরাত ও মন্দিরেই বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষ যেমন ধনি, দরিদ্র, ব্যাবসায়ী, কামার, মজুর, কৃষক ইত্যাদি শ্রেণীর মানুষের প্রবেশ করার অধিকার ছিল। এসব লোকজন যার যার নিজস্ব জায়গায় গিয়ে নগরদেবতাদের প্রনামভক্তি ও বিভিন্ন জিনিস উৎসর্গ করত। এতে এই সভ্যতার সার্বজনীন ধর্মব্যাবস্থা সম্পর্কে জানা যায়।

   জিগুরাত: প্রাচীন মেসোপটেমিয়ারর স্বর্গ ও মর্তের সংযোগস্থল 



মেসোপটেমিয়ার সভ্যতা বিশ্বকে দেওয়া সবচেয়ে বড় উপহার হল কিউনিফর্ম লিপি। সুমেরীয়দের আবিষ্কৃত এই লিপিতে 250 টিরও বেশি শব্দ ছিল। এই লিপির আকৃতি কীলক বা ছোট্ট তীরের মতো হওয়ার কারণে এদের কীলক লিপি-ও বলে। কাদামাটির চারকোনা পাতে লেখার পর আগুনে পুড়িয়ে একে স্থায়ী করা হতো।

                                কিউনিফর্ম ট্যাবলেট 



সময়কালের বিচারে মেসোপটেমিয়ার অধিবাসীরা অতি উন্নত চিন্তার কৃষিপদ্ধতি প্রয়োগ করত। উদ্বৃত্ত ফসল মন্দিরে জমা দেওয়ার রেওয়াজ ছিল। কৃষকদের মধ্যে কে কতটা ফসল মন্দিরে জমা দিল এই হিসাব রাখতে পুরোহিতরা পাহারের গায়ে দাগ কেটে মনে রাখার চেষ্টা করত। ক্রমশ এই হিসাব রাখার পদ্ধতিটি প্রাধান্য পেতে শুরু করে। এক পর্যায়ে মেসোপটেমিয়ানরা গনিত শাস্ত্রের উদ্ভাবন ও এর উন্নতিসাধন করতে সক্ষম হয়। মেসোপটেমীয়দের সংখ্যাগুলি মূলত ষষ্ঠিক বা ষাট কেন্দ্রিক ছিল। সেখান থেকেই এক ঘন্টায় ষাট মিনিট ও এক মিনিটে ষাট সেকেন্ডের হিসাব আসে। এছাড়া তারাই প্রথম বছরকে ১২ টি মাসে এবং এক মাসকে ৩০ দিনে ভাগ করে সময় হিসাব করা শুরু করে।
 প্রথমদিকে তাদের ধারণা ছিল পৃথিবীটা চ্যাপ্টা চাকতির মত কিন্তু পরবর্তীতে তাদের মধ্যে গোল পৃথিবীর ধারণা জন্মায় এবং তারাই প্রথম পৃথিবীকে ৩৬০ ডিগ্রিতে ভাগ করার পরিকল্পনা করে। ধারনা করা হয় যে তারাই প্রথম ১২ টি রাশিচক্র এবং জলঘড়ি আবিষ্কার করে।
ধাতুর ব্যাবহারেরে ক্ষেত্রে মেসোপটেমীয়রা বেশ উন্নতি সাধন করেছিল। তারা খৃষ্টপূর্ব ২৫০০ অব্দে তামাব্রোঞ্জের ব্যাবহার শুরু করে। মেসোপটেমিয়ার বিভিন্ন মন্দির এবং জিগুরাট থেকে প্রাপ্ত বিভিন্ন বাসন পর্যবেক্ষণ করলে অনুমান করা যায় যে তারাই তামাটিনের সংমিশ্রনে তৈরী ব্রোঞ্জের আবিষ্কারক। এছাড়াও মনে করা হয়, মেসোপটেমিয়ায় কাচের ব্যবহার খৃষ্টপূর্বাব্দ ১৬০০ থেকে শুরু হয়।

                                        জলঘড়ি 





চিত্রঋণ: ইন্টারনেট 
   


Comments

  1. Pore besh valo laglo, onek kichu jante parlam

    ReplyDelete
  2. onek information jante parlam ...besh bhalo

    ReplyDelete
  3. Interesting!!!😀

    ReplyDelete
  4. তথ্যসমৃদ্ধ ও সুলিখিত।

    ReplyDelete
  5. Khubbbbbbb vhalo hoicheeeeee ❣️💓💜abroooo proud of you 💛

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular posts from this blog

একনজরে জেনে নিন কেমন ছিল ফিনিশীয় সভ্যতার ইতিহাস

একনজরে জেনে নিন কেমন ছিল সুমেরীয় সভ্যতার ইতিহাস