একনজরে জেনে নিন মিশরীয় সভ্যতার ইতিহাস

মিশরীয় সভ্যতা:-


 বর্তমানে উত্তর আফ্রিকার দেশ মিশর যাকে বলা হয়, যা প্রাচীন সভ্যতার লীলাভূমি। আজ থেকে প্রায় ৬ হাজার বছর পূর্বে নীলনদের আববাহিকায় মিশরীয় সভ্যতার উদ্ভব ঘটে। নীল নদের দান বলে খ্যাত মিশর ভৌগলিকভাবে দক্ষিণাঞ্চল (Upper) এবং উত্তরাঞ্চল (Lower) এই দুভাগে বিভক্ত। মিশরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত নীলনদ ভূমধ্যসাগরে মিশেছে, ফলে মিশরের উভয় অঞ্চলে পলিমাটি জমে উর্বরতা বৃদ্ধি পায়। এই সকল কারণে মিশরে নদীমাতৃক নগর সভ্যতা গড়ে ওঠার অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয়।

                     মানচিত্রে মিশরীয় সভ্যতার অবস্থান 



প্রাক-রাজবংশীয় যুগে নীল নদের অববাহিকায় মিশরীয় সভ্যতার সূচনা হয়। এ যুগে মিশরীয়রা কৃষিকাজে সেচব্যবস্থার বিভিন্ন পদ্ধতি আবিস্কার করে। এ ছাড়া তারা লিখন প্রক্রিয়া, উন্নতমানের কাপড় তৈরী, সৌরপঞ্জিকা প্রস্তুত করতে শেখে। তুতানখামেন (খ্রিস্টপূর্ব ১৩৪১ - ১৩২৩) ছিলেন মিশরীয় অষ্টদশ রাজবংশের ফারাও। ৩২০০ খ্রি. পূর্বাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয় প্রাচীন রাজত্বকাল। রাজা মেনেস উত্তর ও দক্ষিণ মিশরকে এক করে একটি বড় সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন।
 প্রাচীন মিশরের সম্রাটদের ‘ফারাও’ বলা হতো। 'ফারাও' শব্দের অর্থ ‘বড়োবাড়ি’। সম্রাটের প্রধান পরামর্শদাতা হিসেবে নিযোজিত থাকতেন একজন প্রধানমন্ত্রী। মিশরের ‘ফারাও’ বা সম্রাটের মধ্যে বিখ্যাত ছিলেন রাজা মেনেস, প্রথমত আহমোজ, রাজা তুথমোস, সম্রাট ইখনাটন এবং প্রথমদ্বিতীয় র‌্যামেসিস। পরাক্রমশালী তৃতীয় র‍্যামেসিসের মৃত্যুর পরে ফারাওদের শাসনব্যাবস্থা ক্রমশ ভেঙ্গে পড়ে। 

          ফারাও রাজবংশের অষ্টাদশতম রাজা তুতানখামেন 



মিশরীয় সমাজ ব্যবস্থায় ধর্মের বিশেষ গুরুত্ব ছিল। রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় ধর্মের প্রভাব ছিল অত্যন্ত প্রকট। রাজা বা ফারাও ছিল প্রধান ধর্মীয় নেতা। ফরাওদের প্রধান দেবতার নাম ছিল ‘আমন রে’। নীলদের দেবতা নামে খ্যাত ছিল 'ওসিরিস'। মিশরীয়রা আত্মার অবিনশ্বরতা ও পূনর্জন্মে বিশ্বাসী ছিল। তাদের ধারণা ছিল দেহ ছাড়া আত্মা ঈশ্বরের সান্নিধ্য লাভে বঞ্চিত হবে। এজন্যই তারা ফারাও বা সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিদের মৃতদেহ সংরক্ষণের জন্য বিজ্ঞান সম্মত পদ্ধতিতে মমি প্রস্তুত এবং সংরক্ষণ করত। মমিকে অক্ষত রাখার জন্য নির্মাণ করা হয় সমাধি স্তম্ভ পিরামিড। মিশরীয় সমাজে পুরোহিতদের মারাত্মক প্রভাব ছিল। খ্রিস্টপূর্ব ১৩৭৫ অব্দে রাজা চতুর্থ আমেনহোটেপের নেতৃত্বে একটি ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলন শুরু হয়। তিনি প্রধান পুরোহিতদের মন্দির থেকে বহিস্কার করে দেন এবং একক দেবতা এটন (Aton বা একেশ্বর) -এর পূজার প্রচলন করেন।
মিশরীয় চিত্রকলা ছিলো পরধর্মী অর্থাৎ ঐ চিত্রকলা নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত ছিল স্থাপত্যের সারফেসের সঙ্গে ও বহুলভাবে ব্যবহৃত হতো রিলিফ ভাস্কর্যে। মিশরের চিত্রকলা যে সামাজিক প্রেক্ষিতে গড়ে উঠেছিল তা ছিলো ধর্ম ও রাজতন্ত্র দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। শিল্পীদের সেভাবে কোনো স্বাধীনতা ছিল না। ফলে তাদের চিত্রকলা হতো গতানুগতিক এবং আদেশের ওপর ভিত্তি করে। আর অধিকাংশ চিত্রের ধরন ছিলো ইলাস্ট্রেশন বা গল্প বলার মতো। প্রাচীর চিত্রে মৃত ব্যক্তির সাথে সম্পর্কিত ঘটনাবলী বা জীবনী স্থান পেয়েছে। তবে প্রথমবারের মতো ছবির দিকে তাকালে এগুলো একথায় দুর্বোধ্য।

                               মিশরীয় দেওয়ালচিত্র 



হায়ারোগ্লিফিক্স: 
মিশরীয়রা যে লিখন পদ্ধতি আবিষ্কার করে নাম ছিল হায়ারোগ্লিফিক (Hieroglyphic) বা চিত্র-লিখন পদ্ধতি। খোদাই কাজ করা বা চিত্রে পদর্শন করা- এই পদ্ধতির ২৫টি বর্ণ ছিল এবং প্রতিটি বর্ণ একটি বিশেষ চিহ্ন-এর দ্বারা অর্থ প্রকাশ করতো। প্রথম মানব জাতি ভাব প্রকাশের ক্ষেত্রে লিখন পদ্ধতির উদ্ভাবনে সক্ষম হয়। 
হায়ারোগ্লিফিক: প্রাচীন মিশরের লিপি।

                                   হায়ারোগ্লিফিক্স



আধুনিক সভ্যতা অনেকটা প্রাচীন মিশরীয় দর্শন ও বিজ্ঞানের নিকট দায়বদ্ধ ছিল। সেই সময়ে মিশরে কারিগরি বিদ্যার প্রসার লাভ করেছিল। ব্রোঞ্জ ব্যবহারের ফলে নানা প্রকার অস্ত্র ও যন্ত্র আবিস্কার হয়। মিশরীয়রা গণিত শাস্ত্র জ্যোতির্বিদ্যায় বিশেষ পারদর্শি ছিল। তারা নিকটবর্তী নক্ষত্রদের পর্যবেক্ষণ করার কৌশল বেশ ভালভাবে আয়ত্ব করেছিল। মিশরীয় বিজ্ঞানীরা সর্বপ্রথম জ্যামিতিগণিত শাস্ত্রের উদ্ভাবন করেন। তারা যোগ-বিয়োগের ব্যবহার জানলে গুণ ও ভাগ করতে জানতো না। 
মধ্য রাজবংশের যুগ থেকে মিশরীয়গণ চিকিৎসা বিজ্ঞানে দক্ষতা অর্জন করেন। মিশরে চক্ষু, দন্ত ও পেটের পীড়া রোগের চিকিৎসা আবিষ্কারে সক্ষম হয়। তারা বিভিন্ন রোগ ও ওষুধের নাম লিপিবদ্ধ করে এবং 'সেটিরিয়া মেডিকা’ নামক ওষুধের তালিকা প্রণয়ন করেন। মৃতদেহকে অক্ষত রাখার জন্য মিশরীয় চিকিৎসা বিজ্ঞানী একধরনের ঔষুধ আবিষ্কার করেছিল।

               বিশেষ পদ্ধতি এবং ওষুধ দ্বারা মমি সংরক্ষণ 



প্রাচীন মিশরীয় শিল্পকলা ও স্থাপত্যের অন্যতম নিদর্শন ‘পিরামিড’। পাথর দিয়ে তৈরী ত্রিকোনাকার পিরামিড আজও মিশরের কায়রো শহর সভ্যতার ইতিহাস বহন করে চলেছে। এ সকল পিরামিডের অভ্যন্তরে মিশরের রাজা এবং সম্ভ্রান্ত লোকদের মৃতদেহ মমি করে রাখা হয়েছে। লক্ষাধিক পাথর টুকরো করে নিখুঁতভাবে জোড়া দিয়ে এই পিরামিড তৈরী করা হতো এবং এক একটা পিরামিড চারশো থেকে পাঁচশ ফুট উচু ছিল। এর থেকে সহজেই অনুমান করা যায় যে মিশরীয়দের বিজ্ঞান ও কারিগরি কৌশল প্রাচীনকাল থেকেই খুব উন্নত ছিল।
গিজার মহা পিরামিড বা খুফুর পিরামিড (ইংরেজি: Great Pyramid of Giza) গিজার গোরস্তানের তিনটি পিরামিডের মধ্যে সবচাইতে পুরাতন এবং বড়। এটি বর্তমান মিসরের এল গিজা নামক স্থানের কাছে অবস্থিত। 
মিশরীয় সভ্যতা ছিল মূলত ব্রোঞ্জযুগের সভ্যতা। ব্রোঞ্জ ব্যবহারের ফলে নগর সভ্যতা সৃষ্টিতে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয়। এ সময় নানা আবিস্কারই নগর সভ্যতা বিশেষ করে মিশরে নগর সভ্যতার উদ্ভবে সক্ষম হয়। তাই, মিশরীয় সভ্যতাকে আধুনিক সভ্যতার পথ প্রদর্শক হিসেবে গণ্য করা হয়।

               খুফুর পিরামিড (Great Pyramid of Giza) 





 চিত্রঋণ: ইন্টারনেট 






Comments

  1. It's very interesting and informative 😃😃

    ReplyDelete
  2. It's very interesting 😇😇

    ReplyDelete
  3. Nicely explained and presented 👍

    ReplyDelete
  4. মিশরের পিরামিড সম্পর্কে
    অনেক অসাধারণ কিছু জানতে পারলাম
    ধন্যবাদ ❤️❤️

    ReplyDelete
  5. Khub vhalo hoiache 😌❣️proud of you ❣️egia jou roo.. Always my best wishes, prayers with youu. 🤲🏿🤞🏿✨

    ReplyDelete
  6. Very interesting, nice 👍

    ReplyDelete
  7. বাহ ভালো লিখেছিস❤️👌

    ReplyDelete
  8. কয়েকটি নতুন তথ্য পেলাম

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular posts from this blog

একনজরে জেনে নিন কেমন ছিল ফিনিশীয় সভ্যতার ইতিহাস

একনজরে জেনে নিন মেসোপটেমিয়া সভ্যতার ইতিহাস

একনজরে জেনে নিন কেমন ছিল সুমেরীয় সভ্যতার ইতিহাস